শনিবার ১৬ মে ২০২৬ - ১১:২৮
বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝে মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ

'বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝে মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ' প্রসঙ্গে বিবৃতি জারি করেছেন হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাকবুল হাসান (বিশিষ্ট গবেষক ও মুবাল্লিগ পশ্চিম বঙ্গ ভারত) 

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, অস্থিরতার প্রকৃতি ও উম্মাহর বর্তমান অবস্থান

আমরা এমন এক বৈশ্বিক বাস্তবতার মুখোমুখি যেখানে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন ও নৈতিক অবক্ষয় একসঙ্গে চরম আকার ধারণ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে মুসলিম উম্মাহ বহুমুখী চাপের সম্মুখীন-গাজা থেকে ইরান ইরাক, আফ্রিকা থেকে এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম জনগোষ্ঠী সরাসরি সহিংসতা ও বঞ্চনার শিকার। অনেকে মনে করেন, উম্মাহর ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কিন্তু আমি বলব, বিপরয়ই ভোরের আগমনী বার্তা বহন করে।

প্রথম স্তম্ভ: সংকট চিহ্নিতকরণ ও বাস্তব মূল্যায়ন

উম্মাহ আজ যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি:

১. নেতৃত্বের সংকট: অধিকাংশ মুসলিম দেশে নেতৃত্ব নেই আদর্শের, নেই ঐক্যের। বরং আছে বিভাজন, গোষ্ঠীস্বার্থ ও পরাশক্তির অনুগত্য।
২. জ্ঞান-প্রযুক্তিতে পশ্চাৎপদতা: বৈশ্বিক গবেষণা ও উদ্ভাবনে মুসলিম দেশগুলোর অংশ নগণ্য।
৩. অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা: তেল সম্পদ থাকলেও প্রযুক্তি ও খাদ্যশস্যে অন্যের ওপর নির্ভরশীল।
৪. মতানৈক্যের বিষবৃক্ষ: ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব উম্মাহর শক্তি নিঃশেষ করছে।
৫. মিডিয়া যুদ্ধ: ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চরম আকার পেয়েছে।

দ্বিতীয় স্তম্ভ: উম্মাহর অভ্যন্তরীণ শক্তির উৎস

তবুও উম্মাহ অসহায় নয়। আমাদের শক্তির মূল উৎসগুলো হলো:

· ঈমান ও আল্লাহর ওপর ভরসা: এটি সেই অমূল্য পাথেয় যা অন্ধকারেও পথ দেখায়।
· কুরআন-সুন্নাহর (আহলে বাইত) চিরন্তন শিক্ষা: এটি অস্থিরতার মধ্যেও স্থিতিশীলতার দিকনির্দেশনা দেয়।
· তরুণ প্রজন্মের উদ্বুদ্ধতা: আজকের তরুণ-তরুণীরা ব্যতিক্রমধর্মী, তারা ইসলামের মৌলিক আদর্শ বুঝতে চায় এবং পরিবর্তনের অগ্রদূত হতে পারে।
· আত্মত্যাগের ঐতিহ্য: ইতিহাস সাক্ষী, মুসলিম উম্মাহ বারবার চরম সংকট থেকে জাগরণ দেখিয়েছে।

তৃতীয় স্তম্ভ: ভবিষ্যৎ নির্মাণের বাস্তব করণীয়

যদি উম্মাহ আগামী দুই দশকে নিজের ভবিষ্যৎ সচল করতে চায়, তবে নিম্নলিখিত পাঁচটি ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন:

ক্ষেত্র করণীয় প্রত্যাশিত ফলাফল
শিক্ষা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও ইসলামী জ্ঞানের সমন্বয়ে নতুন পাঠ্যক্রম জ্ঞান-ভিত্তিক প্রজন্ম তৈরি
অর্থনীতি ইসলামী ব্যাংকিং, উৎপাদনমুখী শিল্প, আত্মনির্ভরশীল কৃষি পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস
রাজনীতি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক ফোরাম জোরদার (ওআইসি-র সংস্কার) যৌথ কূটনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি
সামাজিক পুনরায় উম্মাহর ঐক্যের নীতিতে বিশ্বাস স্থাপন, গুজব ও বিভ্রান্তি প্রতিরোধ আন্তঃসম্প্রীতি ও সহনশীলতা
মিডিয়া নিজস্ব সাংবাদিকতা ও ডকুমেন্টারি তৈরি, ইসলামের সঠিক বাণী প্রচার আন্তর্জাতিক প্রচারণার পাল্টা শক্তি

চতুর্থ স্তম্ভ: চূড়ান্ত বিশ্লেষণ ও আশাবাদ

বৈশ্বিক অস্থিরতা যদি কিছু স্পষ্ট করে দেখায়, তা হলো-বিদ্যমান ব্যবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর। এই ভঙ্গুরতার সুযোগ উম্মাহর জাগরণের। ইতিহাসের ঘূর্ণাবর্তে প্রায়ই দেখা যায়, অন্ধকার যত গভীর হয়, জ্যোতিষ্ক তত উজ্জ্বল দেখা যায়। মুসলিম উম্মাহ আজ সেই ক্রান্তিলগ্নে, যেখানে নিষ্ক্রিয়তা মানে বিলুপ্তি, আর সচেতন সংহতি ও কর্মপ্রচেষ্টা মানে নবজাগরণ।

আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য-তিনি সেই সম্প্রদায়ের পরিবর্তন আনেন, যারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন আনে (সূরা আর-রাদ, ১১)। ভবিষ্যৎ নির্মাতা সেই ব্যক্তিই হবে, যে বর্তমান সংকটকে চ্যালেঞ্জ নয়, বরং সুযোগ হিসেবে দেখে এবং ইসলামের সার্বজনীন নীতি ধারণ করে আধুনিক কাঠামো গড়ে তোলে।

শেষ কথা “আমি উচ্চারণ করতে চাই, হতাশার কোনো স্থান নেই উম্মাহর মনে। যত বড় অস্থিরতাই আসুক, উম্মাহর ভিত্তি হলো কালিমা, যা অমর। তরুণরা জেগে উঠুক, জ্ঞানীরা ঐক্যবদ্ধ হোক, নেতারা নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করুক। তাহলে ইনশাআল্লাহ, আজকের এই অস্থির বিশ্বের বুকে আগামীকাল উম্মাহর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সভ্যতার নতুন এক উষা।”

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাকবুল হাসান

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha